ভূমিকা
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০৭ ধারা হত্যাচেষ্টার (Attempt to Murder) অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন। কোনো ব্যক্তি যদি অন্য কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে বা এমনভাবে আঘাত করেন, যাতে তার মৃত্যু ঘটতে পারত, তাহলে তার বিরুদ্ধে ৩০৭ ধারায় মামলা হতে পারে। তবে অনেকেই জানেন না, ৩০৭ ধারা কি জামিন যোগ্য, এই ধারায় কী শাস্তি হতে পারে, কিংবা মিথ্যা মামলা হলে কী করণীয়।
এই কারণে ৩০৭ ধারা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি দেখা যায়। তাই এই নিবন্ধে সহজ ও সাধারণ ভাষায় ৩০৭ ধারা কী, এই মামলায় জামিন পাওয়া যায় কি না, শাস্তির বিধান কী এবং মিথ্যা মামলা হলে আইনগতভাবে কী করণীয় এসব বিষয় ধাপে ধাপে আলোচনা করা হয়েছে।
মামলার হাজিরা দিতে কত টাকা লাগে? হাজিরার নিয়ম ও করণীয় (২০২৬-২০২৭)
৩০৭ ধারা মামলা কী?
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০৭ ধারা হত্যার চেষ্টা (Attempt to Murder) সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন। কোনো ব্যক্তি যদি এমন উদ্দেশ্যে বা এমন জ্ঞান নিয়ে অন্য ব্যক্তির ওপর আক্রমণ করেন, যাতে তার মৃত্যু হতে পারত, তাহলে সেই কাজ ৩০৭ ধারার আওতায় পড়তে পারে। অর্থাৎ, ভুক্তভোগী মারা না গেলেও যদি প্রমাণ হয় যে হামলাকারীর উদ্দেশ্য ছিল হত্যা করা বা তার কাজ মৃত্যুর ঝুঁকি সৃষ্টি করেছিল, তাহলে এই ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।
তবে সব গুরুতর মারামারির ঘটনাই ৩০৭ ধারার মামলা হয় না। আদালত প্রতিটি মামলায় ঘটনার প্রকৃতি, ব্যবহৃত অস্ত্র, আঘাতের স্থান, আঘাতের মাত্রা, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং অভিযুক্তের উদ্দেশ্য বিবেচনা করেন। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি ধারালো অস্ত্র বা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আঘাত করেন এবং সেই আঘাতে মৃত্যু ঘটতে পারত, তাহলে ঘটনাটি ৩০৭ ধারার আওতায় আসতে পারে।

৩০৭ ধারা মামলা কি জামিন যোগ্য?
না। সাধারণভাবে 307 ধারার মামলা অজামিনযোগ্য (Non-bailable) হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ, পুলিশ গ্রেপ্তার করার পর অভিযুক্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে জামিন পাওয়ার অধিকারী নন। তবে এর অর্থ এই নয় যে এই ধারার মামলায় কখনোই জামিন পাওয়া যায় না। জামিন দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের হাতে থাকে এবং আদালত প্রতিটি মামলার পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন।
জামিনের আবেদন শুনানির সময় আদালত সাধারণত কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দেন। যেমন, অভিযোগ কতটা গুরুতর, ভুক্তভোগীর আঘাতের অবস্থা কী, ব্যবহৃত অস্ত্র কী ছিল, অভিযুক্ত পলাতক হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না এবং সাক্ষীদের প্রভাবিত করার সম্ভাবনা রয়েছে কি না। এছাড়া মামলার প্রাথমিক সাক্ষ্য-প্রমাণও আদালত বিবেচনা করেন।
যদি আদালত মনে করেন যে তদন্তে কোনো বাধা সৃষ্টি হবে না, অভিযুক্ত পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই এবং জামিন দিলে বিচার কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, তাহলে আদালত আইন অনুযায়ী জামিন দিতে পারেন। তাই ৩০৭ ধারা অজামিনযোগ্য হলেও আদালতের আদেশে জামিন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মিথ্যা মামলা দিলে করণীয় ও গ্রেফতার থেকে বাঁচার উপায় ?
৩০৭ ধারা মামলার শাস্তি
যদি হামলার কারণে ভুক্তভোগী গুরুতর আহত হন, তাহলে আদালত অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে কঠোর শাস্তি দিতে পারেন। তবে প্রতিটি মামলায় একই ধরনের শাস্তি হয় না। আদালত ঘটনার প্রকৃতি, সাক্ষ্য-প্রমাণ, আঘাতের ধরন, অভিযুক্তের উদ্দেশ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করে শাস্তি নির্ধারণ করেন।
দণ্ডবিধির ৩০৭ ধারা অনুযায়ী, হত্যার চেষ্টা প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি আদালত প্রয়োজনে অর্থদণ্ডও দিতে পারেন।

৩০৭ ধারায় মিথ্যা মামলা হলে করণীয়
কখনও কখনও ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ বা পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে দণ্ডবিধির ৩০৭ ধারায় (হত্যাচেষ্টার অভিযোগে) মিথ্যা মামলা করা হতে পারে। এই ধারার মামলা থানায় (এজাহারের মাধ্যমে) অথবা সরাসরি আদালতে (নালিশি মামলা) দায়ের করা যায়। তবে বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৩০৭ ধারার মামলা থানায় রুজু হয়।
৩০৭ ধারার মামলার সঙ্গে প্রায়ই দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩২৬, ৩৫৪, ৩৭৯, ৫০৬, ৫০৬(২) এবং ৩৪ ধারার অভিযোগও যুক্ত থাকতে পারে। কোন মামলায় কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা সম্পূর্ণভাবে ঘটনার প্রকৃতি, আঘাতের ধরন, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করে।
এই ধারায় নিয়মিত মামলা রুজু হলে প্রথমেই মামলার এজাহার বা মামলার কপি সংগ্রহ করে একজন বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আদালতে হাজির হতে হবে কি না, কখন হাজির হতে হবে, জামিনের আবেদন কখন ও কীভাবে করতে হবে এসব বিষয়ে আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিন।
এছাড়া ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত সব ধরনের প্রমাণ, যেমন সিসিটিভি বা ভিডিও ফুটেজ, মোবাইল কল রেকর্ড, লোকেশন তথ্য, চিকিৎসার কাগজপত্র, ছবি বা প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য সংরক্ষণ করুন। তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে সঠিক তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করুন এবং তদন্তে সহযোগিতা করুন।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (Final Report) দাখিল করতে পারেন। আর চার্জশিট দাখিল হলেও বিচার চলাকালে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে আদালত অভিযুক্তকে খালাস দিতে পারেন।
১৪৩, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭, ৩৫৪, ৩৭৯, ৫০৬, ৫০৬ (২), ৩৪ ধারায় মামলা হলে করণীয় কি।
উপসংহার
কারও বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ করা হয়েছে বা থানায় জিডি/অভিযোগ জমা পড়েছে বলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে থানায় এজাহার গ্রহণ করে নিয়মিত মামলা (FIR) রুজু হলে বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে এবং দ্রুত একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। অভিযোগ ও মামলা এক বিষয় নয়; তাই পরিস্থিতি বুঝে আইনগতভাবে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
