ভূমিকা
অনেকেই জানতে চান ৫০৬ ও ৫০৬ ২ ধারা কী ? এই ধারার মামলা কি জামিনযোগ্য? এই ধারায় শাস্তি কি ? আবার অনেকের ধারণা, ৫০৬ ও ৫০৬ (২) দুটি সম্পূর্ণ আলাদা আইন। বাস্তবে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। ৫০৬ ধারার মধ্যেই দুটি ভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। ৫০৬ ধারায় সাধারণ অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে, আর ৫০৬ (২) অংশে গুরুতর ধরনের হুমকির জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
৫০৬ ও ৫০৬ ২ ধারা কী?
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৫০৬ ধারা মূলত অপরাধমূলক ভয় ভীতি প্রদর্শন এর শাস্তি । অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি অন্য কাউকে বেআইনিভাবে ভয় দেখিয়ে হুমকি ধমকি দিয়ে তার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চান, তাহলে ৫০৬ ধারা প্রযোজ্য হবে। সাধারণভাবে কাউকে ক্ষতির ভয় দেখানো, জোরপূর্বক কোনো কাজ করাতে চেষ্টা করা অথবা অন্যায় সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে হুমকি দেওয়া এই ধারার আওতায় আসে।
৩২৩ ৫০৬ ধারা কি, জামিন যোগ্য কিনা, এই ধারায় অপরাধের শাস্তি কি?
অন্যদিকে, ৫০৬(২) ধারায় যেখানে বলা হয়েছে যদি হুমকি এমন হয় যে তা মৃত্যু, গুরুতর আঘাত, অগ্নিসংযোগে সম্পত্তি ধ্বংস, মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন দণ্ডযোগ্য অপরাধ সংঘটনের হুমকি অথবা কোনো নারীর সতীত্ব সম্পর্কে অপবাদ দেওয়ার হুমকির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে সেটি অধিক গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
৫০৬ ও ৫০৬ ২ ধারা কী আলাদা?
অনেকেই মনে করেন ৫০৬ এবং ৫০৬(২) দুটি ভিন্ন আইন। বাস্তবে তা নয়। একই ধারার মধ্যে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী দুটি স্তরের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথম স্তরে অর্থাৎ ৫০৬ ধারায় সাধারণ ধরনের অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা রাখা হয়েছে। যেমন কাউকে ভয় দেখানো বা ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি করা, কিন্তু সেই হুমকি অত্যন্ত গুরুতর নয়।
দ্বিতীয় স্তরে অর্থাৎ ৫০৬ ২ ধারায় এমন হুমকি রাখা হয়েছে যা মানুষের জীবন, শারীরিক নিরাপত্তা বা বড় ধরনের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ, কাউকে হত্যা করার হুমকি, গুরুতর জখম করার হুমকি, আগুন দিয়ে সম্পত্তি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি অথবা এমন অপরাধের হুমকি যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
হুমকির মাত্রা যত গুরুতর, শাস্তিও তত কঠোর। এই কারণেই বাস্তবে ৫০৬ ধারার দ্বিতীয় অংশকে আলাদাভাবে ৫০৬(২) হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
৫০৬ ও ৫০৬ (২) ধারার মধ্যে কোনটি গুরুতর ধারা?
দুটি তুলনা করলে ৫০৬ ২ অংশই অধিক গুরুতর হিসেবে বিবেচিত হয়।
কারণ সাধারণ ৫০৬ ধারায় অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শনের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। কিন্তু ৫০৬ ২ ধারার অংশে বর্ণিত গুরুতর হুমকির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
গ্রেফতারি পরোয়ানা কী? গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে কী করতে হবে
এই কারণে পুলিশ তদন্ত, আদালতের বিচার এবং জামিনের প্রশ্নে ৫০৬ ধারার তুলনায় ৫০৬(২) এর অভিযোগকে সাধারণ বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
৫০৬ ও ৫০৬(২) ধারা কেন বেশিরভাগ সময় অন্যান্য ধারার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে?
বাস্তবে শুধু ৫০৬ ধারা দিয়ে মামলা হওয়া তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ধারা অন্যান্য ধারার সঙ্গে একত্রে যুক্ত থাকে।
এর কারণ হলো, হুমকি দেওয়ার ঘটনা অনেক সময় এককভাবে ঘটে না। উদাহরণস্বরূপ, মারধর, জখম, অবৈধভাবে প্রবেশ, চাঁদাবাজির চেষ্টা, সম্পত্তি দখলের চেষ্টা বা অন্যান্য অপরাধ সংঘটনের সময় ভুক্তভোগীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হতে পারে।
তখন অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী ৩২৩, ৩২৫, ৩৪১, ৩৪৭, ৪৪৭, ৩৭৯, ৩৮৫, ৫০৬ সহ একাধিক ধারা একসঙ্গে প্রয়োগ করা হতে পারে। তবে কোন ধারাগুলো যুক্ত হবে, তা সম্পূর্ণভাবে ঘটনার প্রকৃতি, অভিযোগ এবং তদন্তে পাওয়া প্রমাণের ওপর নির্ভর করে।
৫০৬ ও ৫০৬ ২ ধারা মামলা কি জামিন যোগ্য?
সাধারণ ৫০৬ ধারার ক্ষেত্রে অনেক পরিস্থিতিতে আদালত জামিন বিবেচনা করতে পারেন। আদালত অভিযোগের গুরুত্ব, সাক্ষ্যপ্রমাণ, আসামির আচরণ, তদন্তের অবস্থা এবং অন্যান্য আইনি বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেন।
অন্যদিকে ৫০৬(২)-এর অভিযোগ গুরুতর প্রকৃতির হওয়ায় জামিনের বিষয়টি আদালত আরও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করেন। যদি মামলায় হত্যা, গুরুতর আঘাত বা অন্য গুরুতর অপরাধের হুমকির অভিযোগ থাকে, তাহলে আদালত মামলার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জামিন দেবেন কি না তা নির্ধারণ করেন।
কিভাবে জামিন নিবেন, জামিনের পদ্ধতি।
কিছু ধারাকে জামিন যোগ্য ও অজামিন যোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক সময় ৫০৬ ও ৫০৬ ২ ধারার মত সাধারণ মামলায় অভিযুক্তদের জামিন পেতে দেরি হয় । আবার খুন ডাকাতির ছিনতাই বা বড় ধরনের অপরাধের ঘটনায় অভিযুক্তরা সহজে জামিন পেয়ে যায়।
উভয় ক্ষেত্রেই আদালত অভিযুক্ত ব্যাক্তির সংশ্লিষ্টতা,অপরাধের মাত্রা, মামলার তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিবেচনা করে জামিন দেন। তবে বাস্তবিক ক্ষেত্রে ৫০৬ বা ৫০৬ (২) বা আমলের অযোগ্য মামলায় অভিযুক্তদের জামিন পাওয়া সহজ হয়।
৫০৬ ও ৫০৬ ২ ধারা মামলার শাস্তি কী?
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী সাধারণ ৫০৬ ধারা: অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শনের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
৫০৬ ধারার দ্বিতীয় অংশ ৫০৬ ২ : যদি হুমকি মৃত্যু, গুরুতর আঘাত, অগ্নিসংযোগে সম্পত্তি ধ্বংস, মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন দণ্ডযোগ্য অপরাধ অথবা নারীর সতীত্ব সম্পর্কে অপবাদ দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
অবশ্য আদালত প্রতিটি মামলার বাস্তব ঘটনা, সাক্ষ্যপ্রমাণ, সাক্ষীর জবানবন্দি এবং আইনগত দিক বিবেচনা করে শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করেন। তাই সব মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি হবে এমন নয়।
