ভূমিকা
যৌতুক বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও আইনগত সমস্যা। বিয়ের সময় বা বৈবাহিক সম্পর্কের আগে-পরে এক পক্ষের কাছে অর্থ, সম্পদ বা মূল্যবান কোনো কিছু দাবি করা, গ্রহণ করা কিংবা প্রদানের সঙ্গে জড়িত থাকা আইনত অপরাধ হতে পারে।
বাংলাদেশে যৌতুক প্রতিরোধে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনে যৌতুক দাবি, প্রদান, গ্রহণ এবং এ-সংক্রান্ত চুক্তির জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। এই আর্টিকেলে যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারা মামলার শাস্তি কি? জামিন যোগ্য কিনা এসব বিষয় সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।
যৌতুক মামলা কি?
বাংলাদেশে যৌতুক সংক্রান্ত অপরাধের প্রধান আইন হলো যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮। এই আইনে বিবাহের কোনো পক্ষের কাছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌতুক দাবি করা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একইভাবে যৌতুক প্রদান, গ্রহণ, প্রদানে বা গ্রহণে সহায়তা করা কিংবা যৌতুক প্রদানের উদ্দেশ্যে চুক্তি করাও অপরাধ। BD Laws+1
তাই সাধারণভাবে, বিয়েকে কেন্দ্র করে আইন দ্বারা নিষিদ্ধ যৌতুক দাবি, প্রদান বা গ্রহণের অভিযোগে যে মামলা করা হয়, তাকে যৌতুক মামলা বলা হয়।
তবে কোনো মামলায় শুধু “যৌতুক” শব্দটি থাকলেই একই ধরনের আইনি ব্যবস্থা হবে এমন নয়। মামলায় কোন ঘটনা ঘটেছে এবং কোন কোন আইনের ধারা প্রযোজ্য হয়েছে, তার ওপর মামলার প্রকৃতি ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া নির্ভর করে।
যৌতুকের জন্য খুন, গুরুতর আঘাত, সাধারণ আঘাত করার শাস্তি কি ?
যৌতুক মামলার শাস্তি
যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩ অনুযায়ী, বিবাহের কোনো এক পক্ষ যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্য পক্ষের কাছে যৌতুক দাবি করেন, তাহলে তিনি অপরাধী হিসেবে গণ্য হতে পারেন। এ অপরাধের জন্য অন্যূন ১ বছর এবং অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ড, অথবা অনধিক ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। BD Laws
অন্যদিকে, ধারা ৪ অনুযায়ী যৌতুক প্রদান বা গ্রহণ করা, এতে সহায়তা করা অথবা যৌতুক প্রদান বা গ্রহণের উদ্দেশ্যে চুক্তি করাও অপরাধ। এ ক্ষেত্রেও ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। BD Laws
অর্থাৎ যৌতুক শুধু দাবি করাই নয়; আইন অনুযায়ী যৌতুক প্রদান, গ্রহণ বা সংশ্লিষ্ট কাজে সহায়তার ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রয়েছে।
যৌতুক মামলার জামিন
যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর অধীনে সংঘটিত অপরাধগুলো আইন অনুযায়ী cognizable, non-bailable এবং compoundable। অর্থাৎ এই আইনের অপরাধগুলো অজামিনযোগ্য (non-bailable) হিসেবে নির্ধারিত। Blast+1
তবে অজামিনযোগ্য (non-bailable) মানে জামিন কোনোভাবেই পাওয়া যাবে না—এমন নয়। জামিনের আবেদন করা যায় এবং আদালত মামলার পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইন বিবেচনা করে জামিনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। ফলে কোনো নির্দিষ্ট যৌতুক মামলায় জামিন হবে কি না, তা মামলার ধারা, অভিযোগ, তদন্তের অবস্থা এবং আদালতের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে।
গ্রেফতারি পরোয়ানা কী? গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে কী করতে হবে
মিথ্যা যৌতুক মামলা হলে করণীয়
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি সত্যিই ভিত্তিহীন বা মিথ্যা অভিযোগ করা হয়, তাহলে আবেগের পরিবর্তে আইনগতভাবে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। প্রথমে মামলার এজাহার/অভিযোগের কপি সংগ্রহ করে কোন কোন ধারা দেওয়া হয়েছে তা জানতে হবে।
এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী—
-
দ্রুত একজন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া;
-
মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র ও অন্যান্য নথির কপি সংগ্রহ করা;
-
অভিযোগের বিপরীতে নিজের পক্ষে থাকা বৈধ নথি ও প্রমাণ সংরক্ষণ করা;
-
প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী জামিনের আবেদন করা;
-
তদন্তের সময় আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী নিজের বক্তব্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করা;
-
আদালতের মাধ্যমে প্রযোজ্য আইনগত প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে।
উপসংহার
যৌতুক একটি সামাজিক ও আইনগত সমস্যা। বাংলাদেশে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ যৌতুক দাবি, প্রদান ও গ্রহণের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান করেছে। একই সঙ্গে জেনেশুনে অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ভিত্তিহীন যৌতুক মামলা বা অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রয়েছে।
যৌতুক মামলায় অভিযুক্ত হলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত মামলার ধারা ও নথিপত্র যাচাই করে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। একইভাবে যৌতুকের প্রকৃত শিকার ব্যক্তিরও আইনগত সহায়তা নেওয়া উচিত। কারণ, সঠিক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত প্রক্রিয়ায় এগোনোই উভয় পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
