ভূমিকা
অনেকেই জানতে চান ১০৭ ১১৭ ধারা কি, ১০৭ ধারা মামলার শাস্তি কি, ১১৭ ধারা মামলা কি, অথবা ১০৭ ধারায় মিথ্যা মামলা হলে করণীয় কী। এই আর্টিকেলে ১০৭ ও ১১৭ ধারা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
১০৭ ও ১১৭ ধারা কি?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ১০৭ ও ১১৭ ধারা হলো শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য ঝগড়া, মারামারি বা শান্তিভঙ্গ প্রতিরোধের জন্য নেওয়া একটি আইনগত ব্যবস্থা। কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের কারণে ভবিষ্যতে শান্তিভঙ্গ বা সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকলে বিষয়টি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপস্থাপন করা হতে পারে।
১০৭ ধারা মূলত সম্ভাব্য শান্তিভঙ্গ প্রতিরোধের জন্য প্রযোজ্য। এ ধারায় প্রয়োজন মনে করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শান্তি বজায় রাখার মুচলেকা বা বন্ড দিতে বলা হতে পারে।
অন্যদিকে, ১১৭ ধারা হলো সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া। ম্যাজিস্ট্রেট উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে প্রয়োজনীয় প্রমাণ ও সাক্ষ্য বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেন।
তাই সহজভাবে বলা যায়, ১০৭ ধারা হলো শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা প্রতিরোধের মূল ব্যবস্থা এবং ১১৭ ধারা হলো সেই বিষয়ের অনুসন্ধান ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া। এ কারণে আদালতের নথিতে অনেক সময় ১০৭/১১৭ ধারা একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়।
গ্রেফতারি পরোয়ানা কী? গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে কী করতে হবে
১০৭ ও ১১৭ ধারায় পুলিশ কোন ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন দেয়
কোনো বিরোধের কারণে ভবিষ্যতে মারামারি, সংঘর্ষ বা শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা তৈরি হলে তা প্রতিরোধের জন্য সাধারণত ১০৭/১১৭ ধারার কার্যক্রম নেওয়া হয়।
- জমি-জমা ও দখল বিরোধ: জমির সীমানা, দখল, রাস্তা ব্যবহার বা উত্তরাধিকার সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থেকে সংঘর্ষের আশঙ্কা হলে।
- পারিবারিক বিরোধ: ভাই-ভাই বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে কলহ বা পারিবারিক দ্বন্দ্ব পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে।
- হুমকি ও ভয়ভীতি: কাউকে হুমকি দেওয়া বা ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হলে শান্তি বজায় রাখার জন্য।
- প্রতিবেশী বিরোধ: রাস্তা, গাছ, ড্রেনেজ বা অন্যান্য সামাজিক বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকে ঝগড়া বা সংঘর্ষের আশঙ্কা হলে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশ মনে করলে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না রাখলে ভবিষ্যতে শান্তিভঙ্গ হতে পারে, তখন ১০৭ ধারার কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রসিকিউশন প্রদান করে।
১০৭ ও ১১৭ ধারায় প্রসিকিউশন দিলে কি হয়
১০৭ ও ১১৭ ধারায় প্রসিকিউশন দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের শাস্তি দেওয়া নয়; বরং ভবিষ্যতে শান্তিভঙ্গ, মারামারি, ঝগড়া বা জনশান্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা প্রতিরোধ করা।
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১০৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এমন কাজ করতে পারে বলে আশঙ্কা থাকলে যাতে শান্তিভঙ্গ, জনশান্তি বিঘ্নিত বা অন্যায় কাজ সংঘটিত হতে পারে, পুলিশ বিষয়টি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১০৭ ও ১১৭ ধারায় প্রসিকিউশন এর মাধ্যমে করে।
প্রসিকিউশন দিলে কি ওই ব্যক্তি অপরাধী হয়ে যায়?
১০৭/১১৭ ধারার কার্যক্রম মূলত প্রতিরোধমূলক (preventive) ব্যবস্থা। অর্থাৎ পুলিশ কাউকে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করছে না। বরং ভবিষ্যতে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বিষয়টি আনা হয়।
পুলিশ ১০৭ ও ১১৭ ধারায় প্রসিকিউশন দেয় মূলত শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং সম্ভাব্য ঝগড়া, মারামারি বা শান্তিভঙ্গ প্রতিরোধ করে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য।
৫০৬ ও ৫০৬ ২ ধারা কী? এই ধারার মামলা কি জামিন যোগ্য, শাস্তি কি। বাংলাদেশ
১০৭ ও ১১৭ ধারা কি জামিন যোগ্য?
এটি মানুষের সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত প্রশ্নগুলোর একটি। অনেকেই আদালতের নোটিশ পাওয়ার পর আতঙ্কিত হয়ে ভাবেন যে তাকে হয়তো জেলে যেতে হবে। বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১০৭ ও ১১৭ ধারা জামিনযোগ্য প্রকৃতির কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হয়।
কারণ এই ধারাগুলোর উদ্দেশ্য কোনো অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়া নয়। বরং আদালত নিশ্চিত করতে চান যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভবিষ্যতে শান্তিভঙ্গ করবেন না। এজন্য আদালত মুচলেকা বা বন্ড গ্রহণ করার আদেশ দেন।
১০৭ ও ১১৭ ধারার মামলার প্রক্রিয়া কী?
অনেকেই মনে করেন ১০৭ বা ১১৭ ধারার মামলা দায়ের হলেই সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি হয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। সাধারণত কোনো ব্যক্তি শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা বা নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগ নিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আবেদন করেন। আবেদন পাওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেট প্রাথমিকভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করেন এবং অভিযোগের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখতে পেলে প্রতিপক্ষকে নোটিশ প্রদান করেন।
এরপর উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগকারী তার অভিযোগের পক্ষে বক্তব্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান। শুনানি শেষে ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন যে সত্যিই শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে তিনি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শান্তি বজায় রাখার মুচলেকা বা বন্ড দিতে নির্দেশ দিতে পারেন। অন্যদিকে অভিযোগের সত্যতা না পেলে কার্যক্রম খারিজও হতে পারে।
১০৭ ধারা মামলার জবাব কিভাবে দিতে হয়?
যদি আপনার নামে ১০৭ ধারার নোটিশ আসে, তাহলে ভয় না পেয়ে আইনগতভাবে জবাব দেওয়া উচিত। অনেকেই আদালতের নোটিশ পাওয়ার পর আতঙ্কিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেন, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
প্রথমে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে মামলার নথি সংগ্রহ করুন। অভিযোগে কী বলা হয়েছে তা ভালোভাবে বুঝে লিখিত জবাব প্রস্তুত করুন। জবাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন কেন অভিযোগটি সঠিক নয় বা কেন আপনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন।
প্রয়োজনে সাক্ষী হাজির করুন এবং আপনার পক্ষে থাকা নথিপত্র দাখিল করুন। মনে রাখতে হবে, আদালত একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত দেন না; উভয় পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করেই আদেশ প্রদান করেন।
১০৭ ধারার মামলায় কী কী প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ?
মামলার ফলাফল অনেকাংশে প্রমাণের উপর নির্ভর করে। তাই আপনার বিরুদ্ধে ১০৭ বা ১১৭ ধারার কার্যক্রম শুরু হলে প্রমাণ সংগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব প্রমাণ কার্যকর হতে পারে:
- জমির দলিল, খতিয়ান বা অন্যান্য মালিকানার কাগজপত্র।
- সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এর কপি।
- মোবাইল কল রেকর্ড বা মেসেজ।
- অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিং।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা বার্তা।
- স্থানীয় নিরপেক্ষ সাক্ষীর সাক্ষ্য।
- পূর্বের আদালতের আদেশ বা মামলা সংক্রান্ত নথি।
যত বেশি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা যাবে, তত সহজে প্রকৃত ঘটনা আদালতের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
অনলাইনে মামলা দেখার উপায় ও মামলার অনুসন্ধান [২০২৭-২০২৮]
১১৭ ধারায় মিথ্যা মামলা হলে করণীয়
যদি আপনি মনে করেন যে ১০৭ ও ১১৭ ধারার কার্যক্রম সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, তাহলে বিষয়টি আদালতের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
লিখিত জবাবে অভিযোগের অসত্যতা তুলে ধরুন। অভিযোগকারীর বক্তব্যের অসঙ্গতি থাকলে তা আদালতের নজরে আনুন। প্রয়োজনীয় সাক্ষী ও নথিপত্র উপস্থাপন করুন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শুনানির সময় অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় আদালত কার্যক্রম খারিজ করে দেন।
১০৭ ও ১১৭ ধারা মামলার শাস্তি
১০৭/১১৭ ধারার মূল উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়, বরং শান্তিভঙ্গ প্রতিরোধ করা। তাই সাধারণ ফৌজদারি মামলার মতো সরাসরি কারাদণ্ড বা জরিমানাই এর প্রধান ফল নয়।
আদালত প্রয়োজন মনে করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শান্তি বজায় রাখার জন্য মুচলেকা বা বন্ড দিতে নির্দেশ দিতে পারেন। আদালতের নির্দেশ অমান্য করলে বা বন্ড না দিলে আইন অনুযায়ী আটক বা কারাদণ্ডের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
সংক্ষেপে: ১০৭/১১৭ ধারায় মূল ব্যবস্থা হলো শান্তির বন্ড বা মুচলেকা; সরাসরি শাস্তি দেওয়া এর প্রধান উদ্দেশ্য নয়।
উপসংহার
সবশেষে বলা যায়, ১০৭ ১১৭ ধারা কি এটি বোঝার জন্য প্রথমে মনে রাখতে হবে যে এই ধারাগুলোর মূল উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়, বরং সম্ভাব্য শান্তিভঙ্গ ও সংঘাত প্রতিরোধ করা। তাই ১০৭ ধারা কি, ১১৭ ধারা কি, ১০৭/১১৭ ধারা কি জামিন যোগ্য, ১০৭ ধারা মামলার শাস্তি কি, ১০৭ ধারায় মিথ্যা মামলা, ১১৭ ধারায় মিথ্যা মামলা এবং মিথ্যা মামলা হলে করণীয় সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার বিরুদ্ধে এমন মামলা হলে আতঙ্কিত না হয়ে আইনগতভাবে জবাব দিন, আদালতের নির্দেশ মেনে চলুন এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ উপস্থাপন করুন।
