বিদেশে চাকরি, উচ্চশিক্ষা, অভিবাসন, ওয়ার্ক পারমিট কিংবা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য বর্তমানে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট (Police Clearance Certificate – PCC) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দলিল। তবে অনেকের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ, জিডি কিংবা মামলা থাকায় তারা দুশ্চিন্তায় থাকেন যে, মামলা থাকলে কি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়?
আসলে এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ সব ধরনের মামলা বা অভিযোগের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হবে কি না, তা নির্ভর করে আবেদনকারীর বিরুদ্ধে থাকা মামলার ধরন, মামলার বর্তমান অবস্থা, আদালতের কার্যক্রম এবং পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর। তাই বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন।
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স কি?
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট হলো বাংলাদেশ পুলিশের দেওয়া একটি সরকারি প্রত্যয়নপত্র। এই সনদের মাধ্যমে পুলিশ আবেদনকারীর পরিচয় এবং তার বিরুদ্ধে পুলিশের রেকর্ডে কোনো অপরাধমূলক তথ্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করে একটি প্রতিবেদন প্রদান করে।
বিদেশে চাকরি, স্টুডেন্ট ভিসা, ইমিগ্রেশন, ওয়ার্ক পারমিটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কাজে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
মিথ্যা মামলা দিলে করণীয় ও গ্রেফতার থেকে বাঁচার উপায় ?
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স কেন দেওয়া হয়?
পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের মূল উদ্দেশ্য হলো আবেদনকারীর আইনগত পটভূমি যাচাই করা। বিদেশি সরকার, দূতাবাস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান জানতে চায় আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অপরাধমূলক রেকর্ড রয়েছে কি না। সেই কারণেই বাংলাদেশ পুলিশ প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট প্রদান করে।
মামলা থাকলে কি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়?
অনেকেই মনে করেন, মামলা থাকলেই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায় না। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ এমন নয়। মামলা থাকলেই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হবে না—এমন কোনো সাধারণ আইন নেই।
আবার মামলা থাকলে সব ক্ষেত্রেই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হবে এমনটিও বলা যায় না। প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে যাচাই করা হয় এবং মামলার ধরন, বর্তমান অবস্থা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
থানায় অভিযোগ থাকলে কি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়?
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেওয়া হলেও সেটি সব সময় মামলা হিসেবে গণ্য হয় না। অনেক সময় অভিযোগ তদন্তের পর মামলা হয়, আবার অনেক সময় কোনো মামলা হয় না।
শুধুমাত্র থানায় অভিযোগ রয়েছেএই কারণে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যাবে না, এমন কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। অভিযোগের প্রকৃতি ও তদন্তের অবস্থা বিবেচনা করে পুলিশ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
জিডি (GD) থাকলে কি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়?
অনেকেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বা তাদের বিরুদ্ধে জিডি হয়। জিডি কোনো ফৌজদারি মামলা নয়। তাই সাধারণভাবে শুধু জিডি থাকার কারণে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বাতিল হয় না।
তবে জিডির বিষয়বস্তু যদি কোনো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত হয় যেমন খুন , ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, তাহলে পুলিশ যাচাইয়ের সময় সেটি বিবেচনায় নিতে পারে।
ফৌজদারি মামলা কত প্রকার ও কি কি?
থানায় ফৌজদারি মামলা থাকলে কি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়?
যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের হয় এবং মামলাটি এখনও তদন্তাধীন থাকে, তাহলে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। কারণ তদন্তাধীন ফৌজদারি মামলায় এখনো অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ইস্যু করা হয় না।
আদালতে সিআর (CR) মামলা থাকলে কি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়?
অনেক সময় থানায় মামলা না হয়ে সরাসরি আদালতে সিআর (Complaint Register) মামলা দায়ের করা হয়। সিআর মামলা থাকলেই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যাবে না এমন কোনো নির্দিষ্ট আইন নেই। তবে আদালতে মামলার বর্তমান অবস্থা, মামলার প্রকৃতি এবং পুলিশের যাচাই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আদালতে বিচারাধীন মামলা থাকলে কি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়?
যদি থানার তদন্ত শেষে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন থাকে, তাহলে সাধারণত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ বিচারাধীন মামলার রায় এখনো হয়নি। আবেদনকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, সেটিও আদালত তখনো নির্ধারণ করেননি। তাই অনেক ক্ষেত্রে বিচারাধীন ফৌজদারি মামলায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয় না বা অতিরিক্ত যাচাই করা হয়।
মামলা নিষ্পত্তি হয়ে গেলে কি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়?
যদি আদালতে মামলার বিচার শেষ হয়ে যায় এবং আবেদনকারী খালাস পান, মামলা খারিজ হয়ে যায় অথবা অন্য যেকোনোভাবে আইনগতভাবে মামলার নিষ্পত্তি হয়, তাহলে পরবর্তীতে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মামলা কত প্রকার ও কি কি, কারা মামলা করতে পারেন ?
এ ধরনের ক্ষেত্রে অনেক সময় আদালতের রায়, খালাসের আদেশ অথবা মামলা নিষ্পত্তির সত্যায়িত কপি জমা দিতে হতে পারে। এসব নথির মাধ্যমে পুলিশ আবেদনকারীর বর্তমান আইনগত অবস্থা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
মামলা থাকলে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য কী করবেন?
অনেকেই মামলা থাকার কারণে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের আবেদনই করেন না। এটি সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। আপনার বিরুদ্ধে মামলা থাকুক বা না থাকুক, নিয়ম অনুযায়ী পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য আবেদন করুন। কারণ পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত আবেদনকারী নয়, বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে নেয়।
আদালতে দেওয়ানী মামলা চলমান থাকলে POLICE CLERENCE পেতে কোন সমস্যা হয় না। তাছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি ১০৭ ধারায় আদালতে মামলা থাকলেও সমস্যা নাই । অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মামলার প্রকৃতি ও আবেদনকারীর আইনগত অবস্থা বিবেচনা করে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রদান করা হয়েছে। তাই শুধু মামলা আছে ভেবে আবেদন না করা ঠিক নয়।
উপসংহার
মামলা থাকলে কি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়—এর কোনো একক উত্তর নেই। কারণ প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। থানায় অভিযোগ, জিডি বা সিআর মামলা থাকলেই যে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যাবে না, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই।
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স কিভাবে করবেন (বিস্তারিত)।
তবে থানায় তদন্তাধীন বা আদালতে বিচারাধীন গুরুতর ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।অন্যদিকে, মামলা আইনগতভাবে নিষ্পত্তি হয়ে গেলে এবং প্রয়োজনীয় আদালতের নথিপত্র উপস্থাপন করা হলে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার সুযোগ থাকে।
তাই আপনার বিরুদ্ধে মামলা থাকুক বা না থাকুক, অনুমান করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করুন। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে বাংলাদেশ পুলিশই আইন ও প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
